প্রশ্নঃ ভাগা কুরবানী কি করা যাবে?
উত্তরঃরাসুল ছাঃ যে আমল যেভাবে করেছেন আমাদের সেই ভাবে করাই উচিৎ। বিশেষ করে যখন কোনও কিছু করিয়ে দেখানোর সুযোগ থাকার পরেও করা হয়না তখন তা আরো স্পষ্ট হয়ে যায়। যাকে বলা মাকামে যিকরে কোনও কিছু যিকর না করা। রাসুল ছাঃ এর সারাটা জীবন থাকলেন একবার তো পারতেন মুকীম অবস্থায় ভাগা কুরবানী করতে। করার সুযোগ থাকার পরেও না করাটা অটোম্যাটিক মুকীম এবং সফর অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করে দেয়। যেমন এক সাথে হাত তুলে দুয়ার বিষয়টি।
# যেই কওলী হাদীসে আম ভাবে বলা হয়েছে যে, এক উটে দশজন এক গরুতে সাত জন। এই হাদীস থেকেও দলীল গ্রহন আকাশ কুসুস কল্পনার শামিল। কেননা রাসুল ছাঃ এর কওলী হাদীসের ব্যাখ্যা প্রথমত তার আমল থেকে নিতে হয়। আর তার আমল প্রমান করে তিনি এই কাজ শুধু সফর অবস্থায় করতেন। এছাড়া যখন কোনও হুকুমের কথা কোথাও আম ভাবে আসে এবং অন্য জায়গায় তার খাস হওয়াটা প্রমানিত হয় তখন ঐ আম হাদিসকেও বা আয়াতকেও এই হাদীস বা আয়াত দ্বারা খাস করে দেওয়া হয়। যেমন ফিতরার বিষয়ে কিছু হাদীস শুধু গোলামের ফিতরার কথা এসেছে আর কিছু হাদীসে খাসভাবে মুসলিম গোলামের কথা বলা হয়েছে। এই হিসেবে অধিকাংশ মুহাদ্দিস আম হাদিসকে এই খাস হাদীস দ্বারা খাস করেছেন।
# নিজে হাতে কুরবাণী করা রাসুল ছাঃ এর সুন্নাত ভাগা কুরাবনী করলে এই সুন্নাত থেকে অনেক কেই বঞ্চিত হতে হয়।
# ভাগা কুরাবনী দিলে একজনের পক্ষ থেকে আদায় হয় পরিবারের পক্ষ থেকে হয়না অথচ রাসুল ছাঃ ঘোষণা দিয়েছেন যে,
على كل أهل بيت في كل عام أضحية
প্রতি বছর প্রতিটি পরিবারের উপর একটি কুরাবানী।
রাসুল বলছেন প্রতিটি পরিবারের উপর কুরবানী আর আপনি একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকে করছেন। এতে করে রাসুলের বিধান কে লংঘন করা হচ্ছেনা??
# যদিও মেনেও নিই ভাগা কুরবানী মুকিম অবস্থায় করা যাবে তাহলে অবশ্যই তা কোনও নিরুপায় পরিবেশের আলোকে জায়েয বলা যেতে পারে কিন্তু সুন্নাত কুশ্চিন কালেও নয়। রাসুলের সারা জীবনের আমল পরিবারের পক্ষ থেকে একটা কুরবানী করা সুন্নাত আর ভাগা কুরবানী যদি সুন্নাত হয় তাহলে তা মানুষের বানানো সুন্নাত।
প্রশ্ন : মৃত ব্যক্তির জন্য কুরবানী করা জায়েয আছে কি? সঠিক সমাধান জানিয়ে বাধিত করবেন।
উত্তর : মৃত ব্যক্তির জন্য পৃথকভাবে কুরবানী দেওয়ার কোন ছহীহ দলীল নেই। আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর জন্য কুরবানী করেছিলেন বলে তিরমিযী ও মিশকাতে যে হাদীছটি এসেছে (মিশকাত হা/১৬৪২) তা নিতান্তই যঈফ। অন্যকোন ছাহাবী রাসূলের জন্য বা কোন মৃত ব্যক্তির জন্য এভাবে কুরবানী করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।
মৃত ব্যক্তিগণ পরিবারের সদস্য থাকেন না। সুতরাং তাদের উপর শরী‘আত প্রযোজ্য নয়। অথচ কুরবানী দিতে হয় জীবিত ব্যক্তি ও পরিবারের পক্ষ হ’তে। আবদুল্লাহ বিন মুবারক (১১৮-১৮১ হিঃ) বলেন, ‘যদি কেউ মৃত ব্যক্তির জন্য কুরবানী করেই বসে তবে উক্ত কুরবানীর গোশত নিজে না খেয়ে সবটুকু ছাদাক্বা করে দিতে হবে’ (তিরমিযী, তুহফাতুল আহওয়াযী হা/১৫২৮, ৫/৭৮-৮০ পৃঃ)।
প্রশ্ন : একজন ১০ হাযার টাকায় একটি ছাগল কুরবানী করল, আর একজন ৮ হাযার টাকায় দু’টি ছাগল কুরবানী করল, এদের মধ্যে কার ছওয়াব বেশী হবে?
উত্তর : মহান রব্বুল আলামীনের নিকট নিয়ত ও ইখলাছ অনুসারে বান্দার আমল গৃহীত হয়ে থাকে এবং সে অনুপাতে বান্দা নেকী পেয়ে থাকে। যেমন- মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে একমাত্র খাঁটি নিয়ত ও ইখলাছ সহকারে আল্লাহ্র ইবাদত করতে বলা হয়েছে’ (সূরা বাইয়্যেনাহ ৫)। অনুরূপভাবে মহানবী (ছাঃ) বলেন, ‘মানুষের যাবতীয় আমলের ফলাফল তার নিয়তের উপরেই নির্ভরশীল’ (বুখারী হা/১, মিশকাত হা/১)। এছাড়া বিশেষভাবে কুরবানীর বিষয়ে তো পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ‘এগুলোর (কুরবানীর) গোস্ত আল্লাহ্র নিকট পৌঁছে না। আল্লাহ্র নিকট একমাত্র পৌঁছে তোমাদের তাক্বওয়া’ (সূরা হজ্জ ৩৭)।
উল্লিখিত আয়াত ও হাদীছ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কে কত বড় ও কত সংখ্যক কুরবানী করল, সেটি আল্লাহ্র নিকট তেমন বিষয় নয়। আল্লাহ্র নিকট মূল বিষয় হচ্ছে এই যে, কুরবানী দেওয়ার মূলে বান্দার ইখলাছ ও তাক্বওয়া কিরূপ? সে অনুপাতেই তিনি বান্দাকে নেকী প্রদান করবেন। সুতরাং বান্দা তার ইখলাছ ও তাক্বওয়ার ভিত্তিতেই বিবেচনা করবে যে, সাধ্য অনুযায়ী তার কুরবানী কিরূপ ও কত সংখ্যক হওয়া চাই।
অতএব ১০ হাযার টাকায় একটি কুরবানী ও ৮ হাযার টাকায় দু’টি কুরবানীর মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক নেকী প্রাপ্ত হবে, যার ইখলাছ ও তাক্বওয়া অধিক হবে। যদি দু’জনেরই ইখলাছ ও তাক্বওয়া সমান হয়, তবে দু’জনের-ই সমান নেকী হবে। আর তাক্বওয়ার মান নির্ণয়ের মালিক একমাত্র আল্লাহ।
প্রকাশ থাকে যে, কুরবানীর পশুর প্রতি লোমে একটি নেকী হাছিল হওয়া, কিয়ামতের দিন কুরবানীর পশুর শিং, ক্ষুর, লোম ইত্যাদি ওজন হওয়া সম্পর্কিত ফযীলতের আহমাদ, তিরমিযী ও ইবনু মাজার হাদীছগুলির সনদ যঈফ (আলবানী, মিশকাত, ‘উযহিয়া’ অধ্যায় হা/১৪৭০ ও ১৪৭৬-এর টীকা দ্রষ্টব্য)। ফলে এর ভিত্তিতে কুরবানীর নেকী নিরূপণ করা উচিত নয়।
প্রশ্ন : কুরবানীর পশু কোন কোন খুঁৎ থেকে মুক্ত হওয়া জরুরী?
উত্তর : কুরবানীর পশু যে সকল খুঁৎ থেকে মুক্ত হওয়া জরুরী তা ছহীহ হাদীছ সমুহে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তা হল,
বারা ইবনু আযেব (রাঃ) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কুরবানীতে কি ধরনের পশু হ’তে বেঁচে থাকা উচিৎ? রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাতের ইশারা করে বললেন, চার রকমের পশু হ’তে বেঁচে থাকা উচিৎ (১) স্পষ্ট খোঁড়া (২) স্পষ্ট কানা (৩) স্পষ্ট রোগী এবং (৪) জীর্ণশীর্ণ যার হাড়ে মজ্জা নেই (নাসাঈ হা/৪৩৬৯, ইবনু মাজাহ হা/৩১৪৪; মিশকাত হা/১৪৬৫)।
আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাদের নিদের্শ দিয়েছেন, ‘আমরা যেন কুরবানীর পশুর চোখ ও কান উত্তম রূপে দেখে নেই এবং আমরা যেন এমন পশু কুরবানী না করি যার কানের অগ্রভাগ কাটা, শেষ ভাগ কাটা অথবা যার কান গোলাকারে ছিদ্র হয়েছে বা যে পশুর কান বামের দিকে দু’ভাগ হয়ে গেছে’ (তিরমিযী হা/১৪৯৮, নাসাঈ হা/৪৩৭২; ইবনু মাজাহ হা/৩১৪৩; মিশকাত হা/১৪৬৩)।
আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিষেধ করেছেন, ‘আমরা যেন শিং ভাঙ্গা ও কান কাটা পশু দ্বারা কুরবানী না করি’ (ইবনু মাজাহ হা/৩১৪৫, মিশকাত হা/১৪৬৪)।
প্রশ্ন : কুরবানী ইবরাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত, কুরবানীর পশুর প্রত্যেক লোমে নেকী রয়েছে, মর্মে বর্ণিত হাদীছটি কি ছহীহ?
উত্তর : উক্ত মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ। কেউ কেউ জাল বলেও উল্লেখ করেছেন। হাদীছটি হচ্ছে- যায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বলেন, ছাহাবীগণ জিজ্ঞের করলেন, হে আল্লাহ্র রাসুল (ছাঃ)! এই কুরবানী কি? নবী করীম (ছাঃ) বললেন, এটা হচ্ছে তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত। ছাহাবীগণ বললেন, এতে আমাদের জন্য কি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, প্রত্যেক লোমে একটি করে নেকী রয়েছে’ (আহমাদ, মিশকাত হা/১৪৮৬, হাদীছটি জাল, আলবানী, তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/১৪৭৮)। তবে মুসলিম উম্মাহর উপরে যে কুরবানীর নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে তা ইবরাহীম (আঃ) কর্তৃক স্বীয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ) কে আল্লাহ্র রাহে কুরবানী দেওয়ার অনুসরণে ‘সুন্নাত’ হিসাবে চালু হয়েছে (শাওক্বানী, নায়লুল আওত্বার ৬/২৮৮ পৃঃ)।
প্রশ্ন : যুলহিজ্জার চাঁদ উঠলে নখ, চুল ইত্যাদি না কেটে ঈদের ছালাতের পর কাটার এই সুন্নাতটি কি কেবল কুরবানী দাতার জন্য প্রযোজ্য হবে? সঠিক উত্তর দানে বাধিত করবেন।
উত্তরঃ হুকুমটি মূলতঃ কুরবানীদাতাদের জন্য প্রযোজ্য। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘জিলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুরবানী প্রদানের ইচ্ছা রাখে সে যেন কুরবানী সম্পন্ন করা পর্যন্ত স্বীয় চুল ও নখ কর্তন থেকে বিরত থাকে’ (মুসলিম, মিশকাত হা/১৪৫৯)। তবে যারা কুরবানী দিতে অপারগ তারাও যদি খালেছ নিয়তে এ হুকুমটি পালন করেন তবে আল্লাহর নিকটে তা পূর্ণাঙ্গ কুরবানী হিসাবে গৃহীত হবে বলে আশা করা যায়।
প্রশ্ন : কুরবানীর গোশত কত দিন পর্যন্ত রেখে খাওয়া যাবে?
উত্তর : গরীব-মিসকীনকে কুরবানীর গোশত দেওয়ার পর যতদিন ইচ্ছা রেখে খাওয়া যাবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, كُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا তোমরা (কুরবানীর গোশত) খাও, জমা রাখ এবং ছাদাক্বাহ কর’ (মুসলিম, ছহীহ নাসাঈ হা/৪৪৪৩, ‘কুরবানীর গোশত জমা রাখা’ অনুচ্ছেদ; ইরওয়া হা/১১৫৬, ৪/৩৬৯-৭০ পৃঃ, ছহীহ আবুদাঊদ হা/২৫০৩)। উল্লেখিত হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কুরবানীর গোশত জমা রাখার নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা হয়নি। সুতরাং যতদিন ইচ্ছা জমা রেখে কুরবানীর গোশত খেতে পারবে।
প্রশ্ন : কুরবানীর গোশত বন্টন পদ্ধতি কি?
উত্তরঃ কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজ পরিবারের জন্য, এক ভাগ প্রতিবেশী যারা কুরবানী করতে পারেনি তাদের জন্য ও এক ভাগ সায়েল ফক্বীর-মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করবে। প্রয়োজনে উক্ত বন্টনে কমবেশী করায় কোন দোষ নেই (হজ্জ ৩৬; সুবুলুস সালাম শরহে বুলূগুল মারাম ৪/১৮৮; আল-মুগনী ১১/১০৮; মির‘আত ২/৩৬৯; ঐ, ৫/১২০ পৃঃ। উল্লেখ্য, দরিদ্রদের জন্য জমাকৃত গোশত যারা কুরবানী দিয়েছে তাদের মাঝে বন্টন করা ঠিক নয়।
উত্তর প্রদানে
শায়খ শরীফুল ইসলাম মাদানী ও আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাজ্জাক
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন